Devdas Bangla full Movie Download Review | দেবদাস বাংলা ফুল ওয়েব রিভিউ
★★★দেবদাস★★★
দেবদাস পড়ে নি এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বাংলা সাহিত্যের মহামূল্যবান একটি উপন্যাস। এসব সবার জানা।
একটা প্রবন্ধে পড়েছিলাম, লেখক এই উপন্যাসটি মদ খেয়ে কিছুটা মাতাল অবস্থায় লেখা শুরু করেছিলেন বলে তার এক বন্ধুকে চিঠিতে জানিয়েছিলেন। সেই লেখক হলেন বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। উপন্যাসের নাম ‘দেবদাস’। তার লেখা সেই উপন্যাসটি বাংলা এবং বাঙালিদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যাবে তা তিনি নিজেও হয়-তো ভাবেন নি।
শরৎচন্দ্রের বইয়ের পাতার পর এই উপন্যাস নিয়ে যত চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে তার অনেকগুলোই দেখা হয়েছে। শাহরুখ, সৌমিত্র, প্রসেনজিৎ, অভয়, রাহুল আর আমাদের শাকিব খান। কাউকেই আমার ভালো লাগে নি দেবদাস হিসেবে। একমাত্র দেবদাসের সফল চরিত্র আমার কাছে লেগেছে বুলবুল আহমেদকে। এযেনো শরৎচন্দ্রের বইয়ের পাতা থেকে বের হয়ে আসা সত্যিকারের দেবদাস বুলবুল আহমেদ। চাষী নজরুল ইসলাম শাকিবকে দিয়ে দেবদাস বানিয়েছে যা একদম আজাইরা অভিনয়। দেবদাস হবার কোনো যোগ্যতা শাকিবের মধ্যে পাই নি। লুতুপুতু প্রেমের অভিনয় দিয়ে তো আর দেবদাস হওয়া যায় না। দেবদাস হতে হলে আগে দেবদাসকে ধারণ করতে হবে। সাহিত্যের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে হবে। হিন্দি ভাষার শাহরুখের দেবদাস যেমন গার্বেজ লেগেছে, তেমন শাকিবের দেবদাস। শাকিব আর শাহরুখ ভক্তরা আহত হবেন না। সপ্তম শ্রেণী থেকে এখন অব্দি কতবার যে পড়েছি এই উপন্যাস তা মনে নেই।
সবগুলো চলচ্চিত্র একবার করে দেখলেও, বুলবুল আহমেদের দেবদাস দেখেছি একাধিকবার। বুলবুল আহমেদ কি অভিনয়টা দেখিয়েছে। সাদা-কালো পর্দায় কত নিখুঁত অভিনয়। দেবদাস শরৎয়ের উপন্যাস থেকে বের হয়ে ফিরে এসেছে বুলবুল আহমেদ হয়ে। চাষী নজরুল ইসলাম। আমার দেখা এক সেরা নির্মাতা। সেই চাষী নজরুল ইসলামেরই আরেক নির্মাণ বুলবুল আহমেদের দেবদাস। যা লেগেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। তিনিই রিমেক করলো তার ছবি। তবে তাতে প্রাণ ছিলনা। পার্বতী হিসেবে কবরী যেমন অদ্বিতীয়, তেমনি অপু বিশ্বাস একদম বেমানান। ন্যাকামি ছাড়তে পারে না, সে পার্বতী হতে এসেছে। গল্প ও প্রবাহ ঠিক থাকলেও প্রধান চরিত্রগুলোর অভিনয়ে চরম ঘাটতি। চন্দ্রমুখী হিসেবে আনোয়ারা অসাধারণ। তবে মৌসুমী ঠিকঠাক নয়। চুনিলাল হিসেবে যেমন আবদুর রহমান ছিলেন, তেমনই শহিদুজ্জামান সেলিম। তবে আমি আবদুর রহমানকে এগিয়ে রাখবো। কারণ বুলবুল আহমেদের সাথে আবদুর রহমানের মেকিং দারুণ ছিল। এখানে শাকিব আর সেলিমের মেকিংটা গড়ে ওঠে নি।
সত্যি বলতে কি জানেন? দেবদাস নাম শুনলেই বুলবুল আহমেদ সামনে চলে আসে। অভিনয় কাকে বলে তা বুলবুল আহমেদ দেখিয়েছিল। আপনি এই সিনেমা দেখলে মনে হবে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্ভবত বুলবুল আহমেদকে কল্পনা করেই এই উপন্যাস লিখেছেন। জাত অভিনেতার জাত অভিনয়। বইয়ের পাতার পর সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে বুলবুল আহমেদের দেবদাস। সে যাই হোক যারা এখনো এই অসাধারণ উপন্যাসটি পড়েন নি, তারা একবার হলে-ও পড়ে নিবেন। আর বই না থাকলে বুলবুল আহমেদের সিনেমাটা দেখে নিবেন। সাধু ভাষার লেখা অনেকেই স্পর্শ না-ও করতে পারে। তবে সিনেমাটা করবে বলে আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি। অনেকেই আবেগের বস্তুা খুলে বলতে পারেন, শাহরুখের দেবদাস কালজয়ী ও সেরা। হতে পারে আপনার কাছে। আমার কাছে না। হতে পারে ওদের আয়োজন বড়ো ,মেকিং ভালো, সব ভালো। আর নানা মহলে প্রশংসনীয় ও পুরস্কার প্রাপ্ত। তবে ভাষা ও পরিবেশের একটা বিশাল ব্যপার আছে। সে লাগতে পারে আপনাদের ভালো। আমি শুধু আমার কথা বলছি। যা সর্বজনীন নয়। আমার বুলবুল আহমেদকেই সেরা লেগেছে।
চিরন্তন প্রেমের একটা অসাধারণ উপন্যাস। এটা পড়লে শরৎ কি জিনিস ছিল তা জানতে পারবেন। একটু বলি কিছু। মাঝরাতে পাবর্তী দেবদাসের ঘরে এলে দেবদাস ভীত দিশাহীন হয়ে বলে, ‘ভূতের ভয় না করুক, কিন্তু মানুষের ভয় তো করে! কেন এসেছিস পারু?’
নির্বিকার পারু জবাব দেয়, ‘দেবদা, নদীতে কত জল? অত জলেও কি আমার কলঙ্ক চাপা পড়বে না!’ অসাধারণ ছিল সংলাপটা।
দেবদাস উপন্যাসের শেষের যে বাক্যটি রয়েছে সেটি যেকোনো পাঠকের এবং যেকোনো বয়সের মানুষকে নাড়িয়ে দিবে। আমরা সময়ের কোনো একক্ষণে, আমাদের প্রিয় মানুষটাকে হারিয়ে ফেলেছি। পরিত্রাণ প্রার্থনা করি না ঠিকই, তবে দিনশেষে কোনো এক মুহূর্তে প্রিয় প্রাক্তনের স্মৃতি রোমন্থন গেঁথে থাকে। কেউ বেইমানি করে স্থান পরিবর্তন করে, আর কেউ পরিস্থিতির শিকার হয়ে। বেইমানি করে যারা স্থান পরিবর্তন করে তাদের ক্ষমা করতে নেই। ভুলের ক্ষমা হয়, কিন্তু বেইমানির ক্ষমা হয় না। কেউ যদি এক কোটি ভুল করে, তারপরও চোখ বন্ধ করে ক্ষমা করে দিবেন। কিন্তু কেউ যদি বেইমানি করে। তাকে ক্ষমা করবেন না। আজীবনও ক্ষমা করবেন না। বেইমানদের দ্বিতীয়বার ক্ষমা করা মানে নিজেকে নরকে নিক্ষেপ করা। অতএব প্রাক্তন হবার যোগ্যতা সেই রাখে, যে পরিস্থিতি ও সমাজ বাস্তবতার কাছে পরাজিত হয়ে, নিজের ভালোবাসাকে বিসর্জন দেয়। বেইমানরা কখনোই প্রাক্তন হবার যোগ্যতা রাখে না।
মৃত্যু অনিবার্য এবং মৃত্যুর সময় যদি আপনজন পাশে থাকে তাহলে সেই মৃত্যু হয় উপভোগ্য। আর মৃত্যুর সময় যদি প্রিয়জন পাশে না থাকে, তাহলে সেই মৃত্যু হয়ে ওঠে সবচাইতে ভয়ঙ্কর মৃত্যু। এই দৃশ্য যখন আপনি দেখবেন উপন্যাসের শেষে এসে দেখবেন। তখন আপনার চোখ দিয়ে পানি আসবেই। সে আপনি যত শক্ত মনের মানুষই হয়ে থাকেন না কেন তা-ও ব্যথিত হবেনই যদি পাঠটা বুঝে থাকেন তবে।
এই উপন্যাসের দেবদাস শিখিয়ে গেছে, ভালো একজনকেই বাসা যায়। প্রেমে বারবারে পড়লেও ভালোবাসা একজনের সাথেই হয়। চুনিলাল যখন দেবদাসকে চন্দ্রমুখীর কাছে নিয়ে যায়। তখন চন্দ্রমুখীর কামনায় আসক্ত না হয়ে দেবদাস বলে, ‘ ছিঃ কি বিশ্রী দেখতে।’ ছোট একটা উক্তি অথচ কতবড়ো মাহাত্ম্য। এখানে কিন্তু বৈষম্য করা হয় নি। বা কারো চেহারা নিয়ে কটাক্ষ করা হয় নি। এখানে বোঝানো হয়েছে, যে মানুষটাকে মন থেকে ভালোবাসা যায়, সেই মানুষটা পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে সুন্দর ও সেরা। অন্য সবাই তার কাছে তুচ্ছ।
চন্দ্রমুখীকে প্রত্যাখান করে সেই পার্বতীর স্বামীর বাড়ির সামনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। কত স্বাদ ছিল প্রিয় মানুষকে একবার দেখবার। কিন্তু তা আর হলোনা। মরে যেয়েও পারুর মনে রয়ে গেলো চিরস্থায়ী হয়ে। ভালোবাসার মানুষের জন্য এত আক্ষেপ! তা সব মৃত্যুতেই শেষ। সেই মৃত্যু এসে দাঁড়ায় পার্বতীর দুয়ারে। সমগ্র রাস্তাতে দেবদাসের চিন্তা একটায় শেষবারের মতো পারু দেখা। হয় না। গেটের সামনে যখন আসলো তখন দেবদাস মৃত। আর নেই। সব বাঁধ ভেঙে গগনবিদারী চিৎকারে সবাই স্তব্ধ। ভালোবাসা মানুষের মৃত্যু এভাবে কাছে থেকে দেখার যে কি কষ্ট তা পারু প্রকাশ করছিল। সমাজ স্বামী উপেক্ষা করে দেবদাসের নিথর দেহের সামনে কন্দন ও আহাজারি চোখে পানি আনবেই। এই দৃশ্যটা কবরীর চেয়ে আর কেউই ফুটিয়ে তুলতে পারে নি। অতঃপর শরৎচন্দ্রের কথাতেই বলি,
“… মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে সময়ে যেন একটি স্নেহ-করস্পর্শ তাহার ললাটে পৌঁছে – যেন একটিও করুণার্দ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারও এক ফোঁটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে।”
তো দেখে ও পড়ে নিবেন। দেবদাস-বুলবুল-শরৎ -চাষী-কবরী আজীবন বেঁচে থাকবে বাঙালির মনে।
শাকিব খানের দেবদাস
COPYRIGHT: If you believe that any content on this site infringes your copyright,please send a takedown notice using a verifiable email address to: [email protected]We will review your request and respond promptly, typically within 2 business days, to address and remove any infringing content