ম্যানুয়াল যুগ থেকে ডিজিটাল যুগেও যে চঞ্চল দর্শকদের ভরসার জায়গা!
সময়টা ২০০০ এর দিকের, সিডি-ডিভিডি, স্যাটেলাইট তো চলে এসেছিলো নব্বইয়ের দশকেই, ইন্টারনেটের সাথে বাংলাদেশের হাতেখড়ির সময়টা ছিলো একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকটা। কিন্তু যত সময় পাল্টাচ্ছিলো, নতুন নতুন টেকনোলজি আসছিলো, আমাদের দেশের বাংলা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির উদীয়মান সূর্য ততই হারাচ্ছিলো দীপ্তি। একঘেয়ে সেই একই চিত্রনাট্য এবং বারবার সেই একই মুখগুলোর ভীড়ে ইন্ডাস্ট্রি হারাচ্ছিলো দর্শকপ্রিয়তা। বিদেশি সিনেমাগুলো মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছিলো দর্শকদের। ‘মাটির ময়না’র মতো সৃজনশীল চলচ্চিত্র বিশ্ব দরবারে পৌঁছে গেলেও বাংলাদেশে ছিলো নিষেধাজ্ঞা। ঠিক এমনই এক অস্তমিত সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির সময়ে হঠাৎ করে দেখা গেলো নৌকা বাওয়া অবস্থায় বৈঠা হাতে এক তরুণের কন্ঠে-
“নিথুয়া পাথারে নেমেছি বন্ধুরে
ধরো বন্ধু আমার কেহ নাই”
বলছিলাম সেই ২০০৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মনপুরা’ চলচ্চিত্রের ‘সোনাই’ এর কথা। আবার বলা যায়, ‘সোনাই’ হয়ে দর্শকের মন জয় করে ‘মিসির আলী’ হয়ে ওঠা কিংবা আয়নাবাজির ‘আয়না’ হয়ে দর্শককে তার ভেলকিবাজিতে মুগ্ধ করে দেওয়া সেই চঞ্চল চৌধুরী’র কথা। পুরো নাম সুচিন্ত চৌধুরী, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকেই যে চঞ্চলের উঠে আসা। ২০০৯ এ ‘মনপুরা’র মধ্য দিয়েই পরিচালক গিয়াসউদ্দিন সেলিম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো বাংলাদেশের একজন দুর্দান্ত অভিনেতার সাথে৷ দেখতে শুনতে ”Everyday Guy’ ইমেজ হলেও কি যেনো এক অভিনয় নামক জাদু দিয়ে দর্শককে সে হিপনোটাইজ করেও ফেলেছিলো পর্দায়। হয়তো চঞ্চলেরই প্রিয় পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রগুলোর হিপনোটিজম ক্ষমতা থেকেই নিজেকে দীক্ষিত করেছিলেন খানিকটা।
আবার, সময়টা ২০১৬, মানুষের মুখে মুখে
“লাগ ভেলকি, লাগ ভেলকি
আয়নাবাজির ভেলকি লাগ”
‘আয়নাবাজি’ সিনেমার দৃশ্যে দেখা যায় ‘আয়না’ নামের এক কন-আর্টিষ্টকে, যার অভিব্যক্তিতে দর্শকও সেই ভেলকিবাজিতে গলে যায়। ‘আয়না’ চরিত্রের মধ্য দিয়েই পরিচালক অমিতাভ রেজা চৌধুরী তুলে আনে সেই জাত অভিনেতাকে যার জন্য দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সিনেমাহলে। বলা হয় এক দশকের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ সাড়া জাগানো ছিলো এই ‘আয়না’র আয়নাবাজি। আবার, দুই বছর পরই খবর আসে কিংবদন্তী হুমায়ূন আহমেদের ‘মিসির আলী’ আসছে ‘দেবী’ নিয়ে। এবং সে রহস্যময় ডিটেকটিভ চরিত্র ধারণ করলো এই চঞ্চল চৌধুরী, যে চরিত্রে একফোঁটা এদিক সেদিকও তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করতো গোটা বিনোদনজগতে। এরকম একটি চ্যালেঞ্জিং চরিত্রেও দর্শককে এক ফোঁটা আক্ষেপ করার সুযোগ দেননি, রীতিমতো এক অজানা সাসপেন্সেই দর্শকদের মাতিয়ে রেখেছেন ‘মিসির আলী’ তার জাদুতে। আবার, গত দু’বছর ধরে অন্যান্য দেশগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও হয়েছে ওটিটির যাত্রা। এবং চঞ্চল চৌধুরীর নাম যোগ হয়েছে সেই নতুন যাত্রায়ও। বড় পর্দায় কাজ করার সাথে সাথে ওটিটিতে একের পর এক মুক্তি পেয়েছে তাকদীর, কন্ট্রাক্ট, বলি’র মতো ওয়েব কন্টেন্টগুলো।
২০২২ এ এসে এখন গোটা দেশ সরব সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হাওয়া’ সিনেমা নিয়ে। এই সিনেমা নিয়ে যে এতো উন্মাদনা, দর্শকদের এতো ভরসা ‘হাওয়া’ নিয়ে, এই অদ্ভুত উন্মাদনা কেনো তৈরী হলো? অনেকগুলো উত্তরের মধ্যে অন্যতম উত্তর- দর্শকদের সেই ভরসার ‘সোনাই’ কিংবা ভেলকিবাজির কারিগর ‘আয়না’ খ্যাত চঞ্চল চৌধুরী, যিনি এবার এসেছেন দর্শকের ‘চান মাঝি’ হয়ে। শুধুমাত্র দর্শকদের ভরসা বললেও ভুল হবে, পরিচালক গিয়াসউদ্দিন সেলিম হোক কিংবা অমিতাভ রেজা চৌধুরী, আবার নিভৃতচারী পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন, সবারই সেই ভরসার শিখরে ‘চঞ্চল চৌধুরী’রই নাম। হবেও বা না কেনো, তিনি নিজেই স্বীকার করেন যে তার এরকম ক্যারিয়ারে প্রচুর কাজ করার সুযোগ ছিলো, কিন্তু তবুও তিনি কাজ করেছেন বেছে বেছে। দর্শককের ভরসার দায় নিয়ে বারবারই পর্দায় এসেছেন একেবারে অন্য এক রূপে, অন্য এক চঞ্চল হয়ে। সম্প্রতি এক টকশোতে তারকারদের দায়বদ্ধতার সংজ্ঞায়নও করেছেন-
“আমাদের দেশের বড় বড় যারা অভিনেতা-অভিনেত্রী আছেন, ট্রেন্ডিং অ্যাক্টর-অ্যাক্ট্রেস যারা আছেন তাদের বোধহয় একটু চিন্তা করার সময় এসেছে যে তারা কি ব্যবসার পণ্য হয়ে থাকবে নাকি তাদের মধ্য দিয়ে এমন কোনো কাজ হবে যে কাজটি বাংলাদেশের ইন্ডাস্ট্রিকে সারা বিশ্বের দরবারে আলাদা একটা জায়গা করে দিবে?”
ঠিক এ কথাকে মাথায় রেখে, এরকম চিন্তা লালন করে যখন কোনো অভিনেতা বারবারই দর্শকদের মুগ্ধ করে তখন তাকে নিয়ে দর্শকদের মাতামাতি হবে নাও বা কেন? ‘হাওয়া’র ‘চান মাঝি’ চরিত্রে তার যে তুমুল অভিনয়, সে অভিনয়ের জন্যে তার গুণমুগ্ধ প্রশংসা না করে যাবোও বা কোথায়?
COPYRIGHT: If you believe that any content on this site infringes your copyright,please send a takedown notice using a verifiable email address to: [email protected]We will review your request and respond promptly, typically within 2 business days, to address and remove any infringing content