সিনেমা: ‘ঘেটুপুত্র কমলা’
পরিচালক: হুমায়ুন আহমেদ
Movie: Ghetu Putro Komola
Directed by: Humayun Ahmed
Produced by: Faridur Reza Sagar
Production: Impress Teleflim Limited
Written by: Humayun Ahmed
Starring: Tariq Anam Khan, Jayanta Chattopadhy, Munmun Ahmed, Masud Akhanda, Tamalika Karmokar, Samima najamin, Pran Roy
Music by: Maksud Jamil Mintu & S I Tutul
Cinematography: Mahfuzur Rahman Khan
আমার যমুনার জল দেখতে কালো
স্নান করিতে লাগে ভালো
যৌবনও মিশিয়া গেলো জলে😁😁
বিভিন্ন রকম আড্ডায় আমরা এই গান গেয়ে উঠি,,এই গানটি রয়েছে হুমায়ুন আহমদের শেষ সিনেমা ‘ঘেটুপুত্র কমলা’য়। হুমায়ুন আহমেদের শেষ সিনেমা ফলে আগ্রহ নিয়ে দেখে নিলাম। এ সিনেমার কাহিনীতে এমসময়ের মিল না পেলেও দেখতে বসলে মনে হবে আমরা সেই সময়ের আবহে চলে গেছি। ফলে সব বাস্তব মনে হবে।
অনেক বছর আগের ঘেটুগান নামক সংগীতের এক রহস্যময় ও বিচিত্র ধারা নিয়েই সিনেমার কাহিনী নির্মিত হয়েছে। হাওর অঞ্চলের জমিদারেরা পানি বন্দি সময়টুকু বিনোদনের জন্য ঘেটুগানের আয়োজন করতো। ধীরে ধীরে তাদের মাঝে ঘেটুপুত্রদের শারীরিক ভাবে ব্যবহারের কুপ্রথা গড়ে ওঠে। এ সময়ে জমিদারেরা ঘেটুদের সাথে সময় কাটাতো। ফলে সে সময়েয় জমিদার পত্নীরা ঘেটুদের সতীন হিসেবে গণ্য করতো। এমতাবস্থায় জমিদার পরিবারে সৃষ্ট মানসিক টানাপোড়ন ও কিশোর কমোলার অমানবিক অভিজ্ঞতাই সিনেমাটির উপজীব্য বিষয়।
সিনেমায় দেখা যায় ঘেটু পুত্র কমলা। কমলার আসল নাম জহির। এক দরিদ্র পরিবারের ছেলে সে।দু’বেলা পেটপুড়ে খেতে পারে না সে। দরিদ্রের কষাঘাতে বাবা-মা তাকে ঘেটু পেশায় দিতে বাধ্য হয়। কমলার বাবা এক বাউল দলের সর্দার। সেই দলে নাচ করে ঘেটু কমলা। নাচ-গান দিয়ে মনোরঞ্জন করে জমিদারের। এরপর ঘেটুপুত্রের সাথে যৌন উন্মাদনায় মেতে উঠে জমিদার। কমলার আর্তনাদ বাড়ির সবার কানে যায়। কিন্তু কিছুই করার নেই। কেউই যেন কমলাকে মেনে নিতে পারছে না। সবাই তাকে ঘৃণা করে।
কমলাকে সতীন ভাবতে শুরু করে জমিদারের স্ত্রী।সে মায়ের বাড়ি যেতে চেয়েও পারেনা। ফলে সে কাজের মহিলাকে দিয়ে ঘেটুপুত্রকে মেরে ফেলার চক্রান্ত করে। বিনিময়ে নগদ রোপ্যমুদ্রা আর স্বর্ণের বালা দিতে হয়। লোভের কাছে পরাজিত হয় কাজের মহিলার বিবেক। জমিদারের মেয়ে খুবই পছন্দ করে কমলাকে। কমলা ছাদের রেইলিং এর উপর দিয়ে হাটতে পছন্দ করে। কাজের মহিলা অনেকবার চেষ্টা করে কমলাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে। কিন্তু বারবারই জমিদারের মেয়ে এসে পড়ায় বেঁচে যায় কমলা। স্বার্থ হাসিল করার জন্য জমিদারের স্ত্রী ঘরের মধ্যে আটকে রাখে মেয়েকে। যাতে কমলাকে ফেলে দেয়ায় কোন ঝামেলা না হয়। অবশেষে কাজের মহিলা কমলাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে সক্ষম হয়। কমলার বাবা শোকে পাথর হয়ে যায়। মৃত ছেলেকে বাড়ি নিয়ে যেতে চায় না কমলার বাবা। লাশ দাফন হয় জমিদারের বাড়িতেই।
কমলার মায়ের দু:খ কমাতে অনেক টাকা পয়সা দিয়ে দেয় জমিদার। যাতে বাকী জীবন সুখে-শান্তিতে কাটাতে পারে। হাওড়ের পানি নেমে যায়। কমলার বাবা দলের বাকী সকলকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। শুধু থেকে যায় ঘেটুপুত্র কমলা লাশ হয়ে। আগামী বছর আবার হাওড়ে পানি আসবে। কোন এক ঘেটুপুত্র আবার আসবে এই জমিদার বাড়িতে। জমিদারের মনোরঞ্জন করবে। সকলের রোষানলে জ্বলবে ঘেটুপুত্ররা।অথবা কারো হিংসায় লাশ হতে হবে কোন ঘেটুপুত্রকে।
ঘেটুপুত্র কমলা’র কাহিনী ঐতিহাসিকভাবে কতটা সত্য তা জানা নেই। তবে এ চলচ্চিত্রটির ইতিহাসের সময়কাল ব্রিটিশ আমল। প্রায় দেড়শ বছর আগের এক গ্রামীণ পরিবেশের কথা খুঁজে পাওয়া যায় চলচ্চিত্রটিতে। ব্রিটিশ শাসনাধীন (বর্তমান বাংলাদেশের) হবিগঞ্জ জেলার জলসুখা গ্রামের পটভূমিতে চলচ্চিত্রটির কাহিনি চিত্রিত। সে সময় জলসুখা গ্রামের এক বৈষ্ণব আখড়ায় ঘেটুগান নামে নতুন গ্রামীণ সঙ্গীতধারা সৃষ্টি হয়েছিল। নতুন সেই সঙ্গীত ধারাতে মেয়েদের পোশাক পরে কিছু সুদর্শন সুন্দর মুখের কিশোরদের নাচগান করার রীতি চালু হয়। এই কিশোরদের আঞ্চলিক ভাষাতে ঘেটু নামে ডাকা হতো।গ্রাম্য অঞ্চলের অতি জনপ্রিয় নতুন সঙ্গীতরীতিতে নারী বেশধারী কিশোরদের উপস্থিতির কারণেই এর মধ্যে অশ্লীলতা ঢুকে পড়ে। শিশুদের প্রতি যৌনসংসর্গে আগ্রহী বিত্তবানরা বিশেষ করে জোতদার প্রমুখ এইসব কিশোরকে যৌনসঙ্গী হিসেবে পাবার জন্যে লালায়িত হতে শুরু করে।
একসময় এটি সামাজিকভাবে বিষয়টা স্বীকৃতি পেয়ে যায়। হাওর অঞ্চলের জমিদার ও বিত্তবান শৌখিন মানুষরা বর্ষাকালে জলবন্দি সময়টায় কিছুদিনের জন্যে হলেও ঘেটুপুত্রদের নিজের কাছে রাখবেন এই বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে বিবেচিত হতে থাকে। শিশুদের প্রতি যৌনসংসর্গে আগ্রহী বিত্তবানদের স্ত্রীরা ঘেটুপুত্রদের দেখতেন সতীন হিসেবে।
সিনেমার চরিত্র নিয়ে বলতে গেলে বলবো জমিদার হিসেবে তারিক আনাম খান যথেষ্ট ভালো অভিনয় করেছেন। জমিদার কন্যাও উদারতার পরিচয়ে ভালো অভিনয় করেছে। জমিদার পত্নীর চরিত্রে মুনমুন আহমেদ নৃত্যশিল্পী হলেও তার অভিনয়ও অনবদ্য ছিলো।জমিদার পত্নীর দাসী রূপে শামীমা নাজনীন ও বেশ ভালো অভিনয় করেছে। জমিদারের ভাড়াটে চিত্রশিল্পী হিসেবে কণ্ঠশিল্পী আগুনও যথেষ্ট ভালো অভিনয় করেছেন, ঘেটুপুত্র হিসেবে শিশুশিল্পী মামুন সর্বোচ্চ দিয়ে অভিনয় করেছে ওকে দেখে মনে হয়নি অভিনয় করছে ও।ঘেটু দলের প্রধান জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়েয়র অভিনয় আমার কাছে আরও একটু প্রাণবন্ত হইলে বেশি ভালো লাগতো। ডান্স মাস্টার প্রাণ রায়ের অভিনয়ও ছিলো দারুণ। এছাড়াও বাকী কলাকুশলীদের অভিনয় ও বেশ ছিলো। সিনেমার লোকেশন হিসেবে একটি পুরনো জমিদার বাড়ি বেছে নিয়েছেন পরিচালক যা সিনেমার কাহিনীকে আরও গতীময়তা দিয়েছে।
এমন ব্যতিক্রমী কাহিনী নির্মানে হুমায়ুন আহমেদের জুড়ি মেলা ভাড়। এই সিনেমায় হুমায়ুন আহমেদ কমলা চরিত্রের মাধ্যমে সেই সময়ের অসামজিক কুপ্রথা আর সমকামিতার একটি ভয়াবহ দিক প্রকাশ করেছেন যা দেখে আমার মতই সবারই খারাপ লাগবে।কিন্তু হঠাৎ আরও বেশি খারাপ লাগলো মনে পড়ে যে আমাদের জীবনের টুকরো টুকরো কথাগুলো এমন ছোট ছোট দৃশ্য দিয়ে সেলুলয়েডের পর্দায় তুলে ধরার মানুষটিই আর আমাদের মাঝে নেই।🙂
আপনারা চাইলে দেখে নিতে পারেন সিনেমাটি।বাংলাদেশের প্রথম ওটিটি প্লাটফর্ম চরকির পর্দায়ও আছে সিনেমাটি। আমার মতে, গুণী পরিচালক হুমায়ুন আহমেদের শেষ সিনেমা হিসেবে সিনেমাপ্রেমীদের দেখা উচিত।
Watch Online :
COPYRIGHT: If you believe that any content on this site infringes your copyright,please send a takedown notice using a verifiable email address to: [email protected]We will review your request and respond promptly, typically within 2 business days, to address and remove any infringing content